حق بات

ভেবেছিলাম আমি কিছু লিখবো

    (মুহাম্মাদ আব্দুল মান্নান গোলাপনগরী)

আমি অক্ষম অসহায়। আমি চোখের পানি ফেলতে পারি, জিহাদের আগুন ঝরাতে পারিনা। দূর্বলের মতো ফরিয়াদ করতে জানি, সিংহের মতো গর্জন ছোড়তে পারিনা। কারণ,আমার বুকেতো ঈমানী কুওয়ত নেই,আমার দিলেতো উমরী হিম্মত নেই,আমার শিরায়তো সালাদীনী রক্তের উচ্ছাস নেই। আমি চোখের কিছু নোনাজল ফেলতে পারি। আর কিছু লিখতে পারি। তাই ইচ্ছা ছিল, আজ এই নির্জন রাতে শুধু নিজেকে হিম্মত যোগাতে অশ্রুর কালিতে আমি কিছু লিখবো। আমি লিখবো এদেশের অসংখ্য অসহায় শিশুদের কথা, যাদের মাথা গুজাবার মতো ঠাই নেই, অসুখে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই এবং ক্ষুধা নিবারণের সম্মানজনক কোন সুযোগ নেই। এদের জন্য ডাস্টবিনের খাবার কুড়িয়ে খাওয়া কিংবা ভিক্ষাবৃত্তি করে ক্ষুধার জালা নিবারণ করা ছাড়া কোন উপায় নেই। এরা শিক্ষা বঞ্চিত ও শিষ্টাচার বর্জিত পরিবেশে বেড়ে ওঠে হেলায়-অবহেলায়, এবং অনাদরে-অযতনে।

এরা যখন ভাগ্যের এই নির্মম আকাশে শুধু অমাবস্যার আধাঁর দেখে, আলোর কোন হাতছানি পায়না, তখন বাধ্য হয়ে তারা অনাকাঙ্খিত পথে পা বাড়ায়। অথচ যদি সুপরিকল্পিত ভাবে এদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হতো এবং পর্যাপ্ত শিক্ষার খোরাক দেয়া যেত, তাহলে দেশ ও দশের এবং সমাজ ও পরিবেশের জন্য আপদ না হয়ে গণচীনের মতো সম্পদে পরিণত হতো।

ভেবেছিলাম, আমি লিখবো এদেশের সংখ্যালঘুদের কথা, যাদের অনেকের জান মাল ইজ্জত-আব্রু ধ্বংস হয়েগেছে এদেশের রাজনীতির নোংরা দংশনে। হয়তো রাজনৈতিক জেদ মেটাতে, না হয় আন্দোলনের তীব্রতা দেখাতে কিংবা বহিঃবিশ্বের নজর কেড়ে নিজেদের মসনদ পাকাপোক্ত করতে। অথচ আমাদের ইতিহাস ছিল জাতিগত সহাবস্থানের, রাজনৈতিক সহনশীলতার এবং মানুষের প্রতি দয়া ও মমতার।

ভেবেছিলাম, আমি লিখবো এদেশের অগ্নিদগ্ধ বনী আদমের কথা, যারা রাজনৈতিক কিছু নরপশুদের হাতে ইতিহাসের এই নিষ্ঠুরতম নির্যাতনের শিকার। যাদের অনেকে হসপিটালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুযন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে কিংবা আমরণ পঙ্গুত্ব বরণকরে বাড়িতে ফিরছে। কিন্তু হায় ! যাদের হাতে এই রাজনীতির লাগাম, জানিনা তাদের কানে এদের চিৎকার-হাহাকার পৌছে কি না। ওদের চোখে এদের অগ্নিদগ্ধ দেহর নমুনা ভাসে কিনা।

ভেবেছিলাম, আমি লিখবো ৫ই মে শাপলা চত্বরের কথা। যেখানে কয়েক লাখ মুসলমান  জড়ো হয়েছিল ঈমানী কিছু দাবী নিয়ে। যাদের মাঝে ছিলনা ক্ষমতা দখলের কিংবা সরকার পতনের কোন পরিকল্পনা। যারা চেয়েছিল ইসলামের নবীর পবিত্র চরিত্রকে নিষ্কলুষ রাখার এবং ঈমান সাথে নিয়ে মুসলিম পরিচয়ে এদেশে বেচে নিশ্চয়তা। এঁদের নিকট গোলাবারুদ,হাতবোমা কিংবা অন্যকোন মরনাস্ত্র ছিলনা। যাঁদের অনেকে সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে জায়নামাজ বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আবার অনেকে প্রভুরর নিকট মনের বেদন জানাতে দু হাত তোলে মোনাজাত করছিল কিংবা তাসবীহ জপছিল। কিন্তু প্রতিদানে এঁরা ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম নিদনযজ্ঞের শিকার হল। অথচ সিমীত কিছু নাস্তিক ব্লগার, যারা ৯০শতাংশ মুসলমানের ঈমান-আক্বীদায় কোঠারাঘাত করেছিল এবং ইসলামের নবীর পবিত্র চরিত্রে নির্লজ হামলা চালিয়েছিল, তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হল।

ভেবেছিলাম, আমি লিখবো দেশে চলমান খুন, গুম ও বিরাজমান আইন-শৃঙ্খলার কথা। যেখানে মানুষের সাধারণ মৃত্যুর কোন গ্যারান্টি নেই। অন্যায়-অবিচার থেকে মুক্ত থাকার কোন নিশ্চয়তা নেই। এমনকি বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকারটুকুও ভোগ করার মতো কোন সুযোগ নেই। মানুষ যেন আজ স্বদেশে থেকেও পরবাসী। স্বাধীন হয়েও পরাধীন। একটি শ্বাসরুদ্বকর পরিস্থিতিতে জাতি আজ কাতর। কেননা মানুষ আজ মুখখোলে কথা বললে কিংবা কিছু প্রতিবাদের আওয়াজ তোললেতো আর কোন কথা নেই, তাকে যেতে হবে গুমের যমঘরে, না হয় শামিল হতে হবে লাশের মিছিলে।

ভেবেছিলাম, আমি লিখবো আমাদের ঐতিহ্যের স্বর্ণখনি এবং অস্তিত্বের মিনার শিক্ষাঙ্গনের কথা। যেখানে আমাদের সন্তানেরা আঁধার চিরে আলোর পথে বেরিয়ে আসার, বিদ্বেষের বহ্নিশিখায় প্রীতির সুশীতল বারী বর্ষাবার এবং মগজের উদ্যানে মানবিক শষ্যের চাষাবাদ করার সব সোনালী কলকব্জা শিখতে পারে। যেখানে তারা আদশর্ের প্রাণশক্তি দিয়ে বিস্মৃতির মাটি খোড়ে দেশ ও জাতির জন্য আবিস্কার করতে শিখে ঐতিহ্যের স্বর্ণখনি এবং নৈতিকতার সুগন্ধি ও স্বভাবের সৌরভ দিয়ে জয় করতে শিখে যেকোনো দুর্দান্ত(!) দসু্যর মন। কিন্তু হায় ! আমরা যখন দেখি বিদ্যালয়ের মাঠে আমাদের সোনার ছেলেদের হাতে আপন সাথী ভাইয়ের রক্ত ঝরতে ও লাশ পড়তে ! মনে হয় তখন, যেনো এদেশে কোন শাসক নেই, শাসন নেই, আছে শুধু তাদের নোংরা রাজনীতির উত্তাপ ও ক্ষমতা বিস্তারের প্রতাপ ছড়াবার নিজস্ব জগত। হায়!! তারা কি পারেনা জ্ঞানের গভীরতা ও চিত্তের উদারতা দেখাতে, হৃদয়ের কোমলতা ও চিন্তার পবিত্রতা অর্জন করতে। কিংবা এদেশের হর্তা-কর্তা ও নেতা-নেত্রীরা কি পারেনা দৃষ্টির আঁধার দূর করে বিদ্যালয়গুলোকে রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচার এবং বাদ-মতবাদের অনাচার থেকে মুক্ত রাখতে?

ভেবেছিলাম, আমি লিখবো এবং বিগলিত হৃদয়ের তপ্ত অশ্রুতে আমি লিখবো এদেশের মাটির সম্ভাবনা ও মানুষের সম্মাননার কথা। কিন্তু আমি আজ হারিয়েগেছি। আমার মুখের ভাষা আজ হারিয়েগেছে। আমার মনের ভাব ফুরিয়ে গেছে এবং আমার কলমের কালি আজ শুকিয়ে গেছে। আমার মুখে আর প্রতিবাদের ভাষা নেই। আমার বুকে আর প্রতিরোধের হিম্মত নেই। কেননা আমাদের বিবেক আজ আগ্রাসীদের হাতে বন্দী। আহ! আমাদের চিন্তা ও গবেষণায় আজ না আছে দেশের উন্নয়ন, আর না আছে জ্ঞানীর মূল্যায়ন। বিধায় আমরা আপন ভাইয়ের বুকে গুলি চালাতে এবং দেশের যেকোনো স্বার্থ জলাঞ্জলী দিতে আমাদের বিবেকে বিধেনা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ