বড়ভাই ১
দূর থেকে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন লোক নিভুনিভু আলোতে উপুড় হয়ে কী যেনো করছে। সম্ভবত জোয়া জাতীয় কিছু খেলছে। তারা এতোটাই নিমগ্ন যে পাশ দিয়ে বাঘ যদি হুঙ্কার দিয়ে যায়- তারা বুঝবে না।
বড়ভাই সালমানকে জিজ্ঞাস করলেন- ওখানে ওরা কী করছে?
- মনে হয় তাস খেলছে?
- ওদেরকে কি চিনতে পারছিস?
- হ্যাঁ! এরা তো প্রতিদিনই এখানে বসে খেলায়। ঐ যে সাদ্দাম আছেনা! সে-ই মজলিসটা বসায়। তার সাথে সালীম, আসাদ ও সাবুরাও বসে।
- চলতো! ওদেরকে একটু দ্যাখে আসি।
- চলুন!
বড়ভাই আর সালমান মন্থরগতিতে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। প্রায় দশমিনিট দাঁড়িয়ে রইলেন। সাদ্দামের হাতে সিগারেট। পাশে ফিনসিডিলের বোতল রাখা। সাবু খেলছে আর খাচ্ছে। আসাদ আর সালিম হাতের তালুতে কী যেনো কচলাচ্ছে আর নাকের কাছে নিয়ে শুঁকছে।
ছোটদের এতোটা অবনতি ও স্খলন বড়ভাইকে শিহরিয়ে তুললো। ভেতর থেকে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস গলায় এসে আটকে গেলো। তবে খাঁকারিতে পরিবর্তিত হয়ে নীরবতাকে 'বিরক্ত' করলো। আওয়াজ অনুরণ করে সাদ্দাম মাথা তুলে দেখলো। নেশামত্ত সাদ্দাম বড়ভাইকে চিনতে ভুল করলো না। চোখ কপালে উঠে গেলো। সাত-পাঁচ না ভেবে দিলো দৌঁড়। তার এ আকস্মিক দৌঁড়ের কারণ বুঝতে না বুঝতেই বড়ভাই আর সালমান বাকীদের আটকে দিলেন।
মাথা নিচু করে আসাদ, সাবু আর সালিম দাঁড়িয়ে আছে। সামনে একটি বাঁশবেঞ্চে বসে আছেন বড়ভাই। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সালমান। নীরবতা সবাইকে জড়িয়ে রেখেছে। লজ্জায় আসাদরা কথা বলার শক্তি থেকে নিষ্ক্রিয়। কী বলবেন আর কী বুঝাবেন এই চিন্তায় বড়ভাই নিস্তব্ধ। সালমান চেয়ে আছে আসাদদের দিকে। তার আফসোস আর হতাশার উজাড়দৃষ্টি ছড়িয়ে পড়ছে ওদের উপর।
বড়ভাই আসাদকে প্রশ্ন করলেন- তুমি কোন্ ইয়ারে পড়ো?
- অনার্স চতুর্থ বর্ষে।
- তার মানে তুমি একেবারে শেষ পর্যায়ে?
- জ্বী!
- কী নিয়ে পড়ো?
- রাষ্ট্র বিজ্ঞান।
- ওরা কিসে পড়ে?
- সালীম বিএ ১ম বর্ষে আর সাবু অনার্স ২য় বর্ষে।
- তাহলে তো ওরা তোমার জুনিয়র?
- (মাথা নাড়লো আসাদ)
- তোমাদের মাঝে কি জুনিয়র আর সিনিয়র- এ বিষয়টির পরোয়া নেই?
- (আসাদ নীরব)
- দ্যাখো! আমাদেরকে মা-বাবা অনেক আশা ও ভরসা নিয়ে এই বিদ্যালয়ে পড়ার জন্য পাঠিয়েছেন। উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে আমরা তাদের মুখে হাসি ফুঁটাবো। সমাজে তারা মাথা উঁচু করে চলতে পারবে। আমার যদি ভুল না হয় তাহলে তো বলছি- তোমাদের পিতা-মাথা অনেক কষ্ট করে পড়ালেখার খরচ যোগাড় করে দেন। বলোতো আসাদ তোমার পিতা কী করেন?
- জ্বী! মানে! তিনি গ্রামে থাকেন। কৃষি কাজ করেন?
- তোমাকে মাসে কতো টাকা দেন?
- পাঁচ থেকে ছ' হাজার।
- আয়ের উৎস কি?
- ধান, সবজি ইত্যাদি বিক্রি করে.....
- তোমার জন্য আফসোস হে আসাদ! তোমার পিতা না জানি কতো কষ্ট করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তোমার লেখাপড়ার খরচ দেন আর তুমি নাকি...... তুমি কি ভেবেছো! তিনি যদি শোনেন তুমি এখানে এসব করছো, তাঁর কী পরিমাণ কষ্ট হবে? আর তোমরাও তো মনে হয় এরকম পিতার সন্তান? সাবু আর সালমানকে জিজ্ঞাস করলেন।
- আমার পিতা-মাতা শহরে থাকেন। সবজি বিক্রেতা। মা বুআর কাজ করেন। সাবু বলল। সালীম কোনো উত্তর দিলো না। সে জোরে জোরে কাঁদতে আরম্ভ করলো। ধপাস করে বড়ভাইয়ের পায়ে ধরে বলতে শুরু করলো- ভাই! আমার পিতা প্যারালাইজড। মা এঘরে ওঘরে কাজ করেন। ভাই-বোন আমরা পাঁচজন। আমিই সবার বড়। কিন্তু পরিবারের জন্য আমি কিছুই করি না...... চোখের পানি মুছতে মুছতে আরোও বললো- আমার মা আমাকে কোনো কাজ করতে দেন না। তিনি বলেন- বাবা! তুমি লেখাপড়া করো। বড় হও। অনেক টাকা কামাইতে পারবে..... সালীমের কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেলো।
বড়ভাই তাকে বুকে টেনে নিয়ে সান্ত্বনা দিতে দিতে বলতে শুরু করলেন- আমাদের প্রত্যেকরই মা-বাবা এমন চায়। কিন্তু আমরা ভার্সিটি জীবনে এসে কেমন যেনো হয়ে যাই। তোমরা তো জানো- সাদ্দাম ছেলেটি তেমন ভালো না। তারপরেও ওর সঙ্গে কেনো চলাফেরা করো? এখন থেকে ওর সঙ্গে আর চলাফেরা করবে না। নেশা-টেশা ছেড়ে দিয়ে আদর্শ মানুষ হওয়ার চেষ্টা করো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে আল্লাহ তাআলার সাহায্য নাও। কী পারবে না তোমরা? সমস্বরে তারা তিনজন বললো- অবশ্যই পারবো ভাই। বড়ভাই ইন শা আল্লাহ বলে তাদেরকে বললেন- তাহলে এখন যাও। শুয়ে পড়ো। এশার নামাজ না পড়ে থাকলে আদায় করে নিও। আর হ্যাঁ! আগামীকাল জোহর পড়ে ২০৯ নম্বর রুমে চলে এসো।
বড়ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তারা তিনজন চোখ মুছতে মুছতে হলের দিকে চলে গেলো। বড়ভাই আর সালমান ভার্সিটির মসজিদের দিকে রওয়ানা দিলেন।
0 মন্তব্যসমূহ